এ কালের এক জীবন্ত মহানায়ক দালাই লামা

dalailama

কল্যাণ মিএ বড়ুয়াঃ উত্তরপূর্ব তিব্বতের অ্যামডো প্রদেশের ছোট্ট গ্রাম তাকট্‌সার-এর পাহাড়ে, তীব্র শীতের রাতে আগুন জ্বালিয়ে অন্তঃস্বত্বা গৃহবধু বসে আছে তার স্বামীর শিয়রে। তিব্বতের এই অঞ্চলটাতে গত কয়েকবছর ধরে ফসল হয়না বললেই চলে। অন্য আর সব গৃহস্থের মত এই গৃহবধু আর তার স্বামীও কষ্টে-সৃষ্টে দিন পার করে দিতে থাকে। কিন্তু গত কয়েক সপ্তাহ ধরে একেবারেই অসুস্থ হয়ে পড়ে গৃহস্বামী। চারদিকের লক্ষণ দেখে গৃহবধুর মনে দানা বাঁধতে থাকে অশুভ আশঙ্কা। একে একে মারা যাচ্ছে ঘরের মুরগী,আস্তাবলের ঘোড়া আর মাঠে বাঁধা ইয়াক। এর মাঝেই একদিন হঠাৎ ভোর রাত্রির খানিকটা আগেই ঘুম ভেঙ্গে উঠে যেতে হয় তাদেরকে। তাদের ঘর আলো করে এসেছে ফুটফুটে এক ছেলে সন্তান। সন্তানের মুখ দেখা তাদের জন্য এবারই প্রথম নয়,এর আগে তাদের ঘরে আরো বারো জন সন্তানের জন্ম হয়েছে, যাদের মধ্যে চারজনকে শুধু তারা বাঁচাতে পেরেছিলো। নবজাতক জন্ম নিয়েই তারস্বরে কান্না করবে তেমনটাই স্বাভাবিক। কিন্তু, এই প্রথম তাদের কোনো সন্তান জন্ম নেয়ার পর কান্না করে উঠেনি। এরকম অদ্ভুত জিনিস তিব্বতের এই সুউচ্চ পাহাড়চূড়ায় অবস্থিত তাকটসার অঞ্চলের লোকজন আগে কখনো দেখেনি। সেই না হয় মেনে নেয়া গেল, কিন্তু তাজ্জব ব্যাপার হলো, ছেলে জন্মের পর থেকেই তার পিতা দিনে দিনে সুস্থ হতে শুরু করেছে,প্রতিদিনই ঘরের চালে এসে বসছে দুটো কাক, কিছুক্ষণ পরেই কাকদুটো চলে যাচ্ছে। প্রতিদিন যেন রুটিন করে এসে তারা দেখে যাচ্ছে সদ্যজাত এই অবাক শিশুটিকে। তাকট্‌সার অঞ্চলে কে না জানে,একমাত্র দালাই লামাদের জন্মের পরই জোড়া কাক এসে উপস্থিত হয় ঘরের চালে। সাধারণ ঘরে জন্ম নেয়া, দালাই লামাদের মত যার জন্মের পর ঘরের চালে জোড়া কাক এসে বসে,সেই অবাক শিশুটির পিতা নিজের এই ছেলের নাম রাখলো লামো,সুরক্ষাকারী। দালাই লামা ১৯৩৫ সালের ৬ই জুলাই তিব্বতে জন্মগ্রহণ করেন।

দালাই লামা। মঙ্গোলিয়ান দালাই আর তিব্বতীয় (ব)লামা শব্দ দুটি থেকে উৎপত্তি হয় দালাই লামা শব্দযুগলের। দালাই শব্দ এর অর্থ সমুদ্র। অন্যদিকে,(ব)লামা শব্দের অর্থ শিক্ষক। বুদ্ধধর্মের গেলুগ (ইয়েলো হ্যাট) শাখার সর্বোচ্চ শিক্ষক তথা ধর্মগুরু এই দালাই লামা। হিন্দুদের গুরু কিংবা ইহুদিদের রাবাই এর সাথে সমতূল্য। শাব্দিক অর্থ না করে, ভাবার্থে প্রকাশ করলে দালাই লামা এর অর্থ গিয়ে দাঁড়াবে বিদ্যাসাগর বা জ্ঞানসাগর গুরু, করুণার সাগরও বলা যেতে পারে । ১৫২৮ সালে মোঙ্গল শাসক আলতাই খান তিব্বতের লাসা অঞ্চলের সোনাম গিয়াৎসো কে সর্বপ্রথম দালাই লামা উপাধিতে ভূষিত করেন। পরবর্তীতে ধারাবাহিকতা বজায় রাখার জন্য সোনাম গিয়াৎসোর পূর্ববর্তী দুইজনকে প্রথম ও দ্বিতীয় দালাই লামা ঘোষণা করা হয়। ফলে, সর্ববপ্রথম দালাই লামা উপাধি পেয়ে থাকলেও দালাই লামাদের কার্যকালক্রমে সোনাম গিয়াৎসো এর অবস্থান গিয়ে দাঁড়ায় তৃতীয় স্থানে।

বৌদ্ধ ধর্ম দুটি প্রধান ধারায় বিভক্ত। একটি হচ্ছে হীনযান (স্থবিরবাদ),অন্যটি মহাযান। এদের মধ্যে মহাযানপন্থীরাবোধিস্বত্ত্ব মতবাদে বিশ্বাস করে। বোধিস্বত্ব(সাধু/সন্যাসী)হচ্ছেন তিনি যিনি জগতের কল্যাণার্থে বারবার জন্মগ্রহণ করেন এবং বিশ্বের সকল জীবের মুক্তিলাভের উপায় করেন। সমস্ত বোধিস্বত্বদের মাঝে সবচেয়ে বেশি পূজিত ও সমাদৃত বোধিস্বত্বের নাম অবলোকিতেশ্বর। মহাযান ধারার গেলুগ উপধারার বৌদ্ধধর্মাবলম্বীরা মনে করেন যে এই অবলোকিতেশ্বরই যুগে যুগে কালে কালে দালাই লামা হয়ে মানুষের রূপ ধারণ পৃথিবীতে আবির্ভূত হয়ে থাকেন। তাই, তিব্বতের জনসাধারণ দালাই লামাকে তাদের স্থানীয় ভাষায় বলে থাকেন কুনডুন,যার অর্থ উপস্থিতি। সময়ের সাথে সাথে মানুষের অগাধ বিশ্বাস ও আস্থার কারণে দালাই লামারা ধর্মগুরু থেকে হয়ে গেছেন রাজনৈতিক গুরুও,হয়ে গেছেন তিব্বতের পার্থিব-অপার্থিব,ইহলৌকিক-পরলৌকিক,এমনকি প্রশাসনিক ক্ষমতারও সবচেয়ে বড় অধিকারী।

নিরীহ শান্তিকামী বৌদ্ধ ভিক্ষুগণ সমাদৃত হতে থাকেন সর্বত্র। তাদের সহজ সরল জীবন যাপন, রীতি-নীতি মনোযোগ আকর্ষণ করে সমস্ত বিশ্বের। অহিংস উপায়ে সমস্যা সমাধানের জন্য নিরলস আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার স্বীকৃতি স্বরূপ ১৯৮৯ সালে দালাই লামা অর্জন করেন নোবেল শান্তি পুরস্কার। দালাই লামা ঘোষণা করেন, কখনো যদি তিব্বতীয়রা চীনের বিরুদ্ধে সংঘাতময় প্রতিরোধ গড়ে তোলার চেষ্টাও করে, তাহলেও তিনি তার পদ ত্যাগ করবেন। তার মতে,প্রতিরোধ অবশ্যই চলবে, তবে সেটা সংঘাতের মধ্য দিয়ে নয়।

মানব সভ্যতার ইতিহাসে বিশ্বাসের উপর ভিত্তি করে অনেক প্রভাবশালী মহানায়কের আবির্ভাব ঘটেছে। সে-সব আজ শুধুই ইতিহাস। ইতিহাসের পাতায় চোখ বুলাতে বুলাতে আমরা ভেবে যাই,কেমন ছিলো তাদের জীবন,কেমন ছিলো তাদের জীবন ব্যবস্থা। বিশ্বাস-অবিশ্বাস,সত্য-মিথ্যার প্রশ্ন পরে আসবে,আগেতো জানতে চাই সেই সমস্ত মহানায়কদের। মনে মনে ভাবি, একবার যদি তাদের সেই সময়ে ফিরে যেতে পারতাম,বসবাস করতে পারতাম সেই সমাজের অংশ হয়ে। কিন্তু একটু চিন্তা করলেই বুঝতে পারা যায়,আমাদের সময়ে,এই আধুনিক সমাজেই,আমাদের মাঝেই আছেন জীবন্ত মহানায়ক- দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া,ঘর হতে শুধু দুই পা ফেলিয়া।

দালাই লামার ৮০ তম জন্মবাষি্কীতে অন্তরের অন্তস্তল থেকে শ্রদ্ধা ঞ্জাপন করছি ও উনার দীঘ্আয়ু কামনা করছি।

পূর্বে প্রকাশিতঃ http://thebuddhisttimes.com/

আরো পোস্ট দেখুন

comments