স্বপ্নের পথে এগিয়ে যাওয়ার গল্প

BangladeshCricket

৩১ মার্চ, ১৯৮৬। অধিনায়ক গাজী আশরাফ হোসেন লিপুর নেতৃত্বে প্রথমবারের মত আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে নামে বাংলাদেশ। পাকিস্তানের বিপক্ষে সেই ম্যাচে মাত্র ৯৪ রানে গুটিয়ে যায় বাংলাদেশ ক্রিকেট দল, সাত উইকেট হাতে রেখেই কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছে যায় পাকিস্তান। কিন্তু এই ম্যাচের মাধ্যমেই ক্রিকেটের আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন একটি দেশের আগমন ঘটে, দেশটির নাম বাংলাদেশ।

সময় গড়িয়ে যায়, আইসিসির সহযোগী সদস্য হিসেবে একটু একটু করে এগিয়ে যেতে থাকে বাংলাদেশ ক্রিকেট। ১৯৯৭ সালে আইসিসি ট্রফির ফাইনালে কেনিয়ার বিপক্ষে শেষ বলে ১ রান প্রয়োজন হয় বাংলাদেশের। পেসার হাসিবুল হোসেন শান্ত শেষ বলে ১ রান নিয়ে বাংলাদেশকে এনে দেন ২ উইকেটের জয়। যার ফলে প্রথমবারের মত ক্রিকেট বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ ও ওয়ানডে ক্রিকেট খেলার যোগ্যতা অর্জন করে বাংলাদেশ।

১৯৯৯ সালে প্রথমবার বিশ্বকাপে অংশ নিয়েই স্কটল্যান্ড এবং ঐ বিশ্বকাপের রানার্সআপ পাকিস্তানকে হারিয়ে দেয় বাংলাদেশ। খালেদ মাহমুদ সুজনের অল-রাউন্ড নৈপুণ্যে শক্তিধর পাকিস্তানকে হারিয়ে টেস্ট স্ট্যাটাস পাওয়ার অন্যতম দাবিদার হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে বাংলাদেশ ক্রিকেট দল। ২০০০ সালের ২৬শে জুন দশম টেস্ট খেলুড়ে দেশ হিসেবে বাংলাদেশ আইসিসির সদস্যপদ লাভ করে। ঐ বছরের ১৩ নভেম্বর নাইমুর রহমান দুর্জয়ের নেতৃত্বে ভারতের বিপক্ষে প্রথম টেস্ট খেলতে নামে বাংলাদেশ।

১৯৯৯ থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত অত্যন্ত কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে যেতে হয় বাংলাদেশ ক্রিকেট দলকে। প্রায় পৌনে পাঁচ বছর একটিও ম্যাচ জিততে না পেরে পুরো দেশ যখন একটি জয়ের আশায় প্রহর গুনছে, ২০০৪ সালের ১০ মার্চ জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে হারারেতে শ্বাসরুদ্ধকর ম্যাচে বাংলাদেশ পায় ৮ রানের স্বস্তির এক জয়। ঐ বছরই ডিসেম্বরে দেশের মাটিতে ভারতের বিপক্ষে প্রথম জয় তুলে নেয় বাংলাদেশ। কোচ ডেভ হোয়াটমোরের অধীনে, অধিনায়ক হাবিবুল বাশারের নেতৃত্বে পরিবর্তনের ছোঁয়া লাগে বাংলাদেশ ক্রিকেটে।

২০০৫ সালের জানুয়ারিতে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে প্রথম টেস্ট জেতে বাংলাদেশ। সফররত জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে প্রথম ওয়ানডে সিরিজ জয়েরও স্বাদ পায় বাংলাদেশ, ৫ ম্যাচের সিরিজ জিতে নেয় ৩-২ ব্যবধানে। ঐ বছরই কার্ডিফে মোহাম্মদ আশরাফুলের দুর্দান্ত সেঞ্চুরিতে তৎকালীন বিশ্বচ্যাম্পিয়ন অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে অসাধারণ এক জয় পায় বাংলাদেশ, পুরো বিশ্ব শুনতে পায় ভয়ংকর এক বাঘের গর্জন।

এরপর শুধুই এগিয়ে যাওয়ার গল্প। বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসে যুক্ত হতে থাকে একটির পর একটি মাইলফলক। ২০০৬ সালে কেনিয়াকে প্রথম হোয়াইটওয়াস, ২০০৭ সালে বিশ্বকাপে ভারত ও দক্ষিণ আফ্রিকা বধ, ২০০৯ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে টেস্ট ও ওয়ানডে সিরিজে হোয়াইটওয়াস, ২০১০ সালে ইংল্যান্ডকে হারিয়ে ওয়ানডেতে সবকটি টেস্ট খেলুড়ে দলের বিপক্ষে জয়লাভ এবং নিউজিল্যান্ডকে বাংলাওয়াস, ২০১২ সালে এশিয়া কাপে রানার্সআপ, ২০১৫ সালের বিশ্বকাপে কোয়ার্টার ফাইনালে উত্তরণ যেন কয়েকটি রূপকথারই নামান্তর। আমাদেরই একজন হয়ে যান বিশ্বসেরা অল-রাউন্ডার, তিনি সাকিব আল হাসান। যারা এক সময় সমালোচনায় মুখর ছিলেন, তারাই এখন বাংলাদেশ ক্রিকেটের প্রশংসায় পঞ্চমুখ।

২২শে এপ্রিল, ২০১৫। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ২৯ বছর পার করা বাংলাদেশের প্রতিপক্ষ সেই পাকিস্তান। মুশফিকুর রহিমের দাপুটে শট যখন বাউন্ডারি পেরিয়ে গেল, বাংলাদেশের ক্রিকেটে আরও একটি ইতিহাস রচিত হল। এক সময়ের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন পাকিস্তানেকে ৩-০ ব্যবধানে হোয়াইটওয়াস করলো বাংলাদেশ। এ যেন একটা ক্রিকেট-পাগল জাতির ২৯ বছরের তিল তিল করে গড়ে ওঠা লালিত স্বপ্নের চাইতেও বেশি কিছু। কত আশা আর আশাভঙ্গের বেদনায় নীল হতে হয়েছে এদেশের কোটি কোটি ক্রিকেট ভক্তকে। তবুও আমাদের স্বপ্নগুলো কখনও ফুরিয়ে যায়নি। নির্ঘুম চোখ জানালায় তারা জেগে থাকে, অবিরাম।

Source: Bangladesh Cricket Board Website

আরো পোস্ট দেখুন

comments