রক্তের বিভিন্ন গ্রুপ, ব্লাড ট্রান্সফিউশন, মা-বাবা গ্রুপিং সমস্যা ও বংশগত রোগ থ্যালাসেমিয়া সম্পর্কে আলোচনা

আমি ডাক্তারি বিদ্যা নিয়ে পড়িনি এবং সে সম্বন্ধে সামান্যতম ধারনাও নেই। তারপরও  মেডিকেল বিষয়ের উপর বই সামনে পেলে এবং ওয়েব থেকে বিভিন্ন অজানা বিষয়ে জানতে চেষ্টাকরি।কারন কিছু কিছু বিষয় আছে সবার জানা খুবই জরুরি

গত কয়েকমাস আগে প্রজন্ম ফোরামে (http://forum.projanmo.com/) ভালো একটি টপিক পেলাম। যা সবারই জানা খুবই দরকার। তাই টপিকটি সবার সাথে শেয়ার করলাম। টপিকটি পড়ে ভাববেননা যে আমি এ বিষয়ে জ্ঞানী। আপনারা আরো কিছু জানলে শেয়ার করুন।

রক্তের বিভিন্ন গ্রুপ, ব্লাড ট্রান্সফিউশন ও মা-বাবা গ্রুপিং সমস্যা সম্পর্কে আলোচনা।

ইমিউনোলজীর ব্যাপার স্যাপার একটু ঝামেলার, তবে সহজ ভাষায় ব্যাখা করার চেষ্টা করা হয়েছে।

আমাদের রক্তের লোহিত কণিকা বা Red blood cell (RBC)-এর গায়ে কয়েক ধরণের প্রোটিন থাকে। যেমন A, B, Rh প্রোটিন ইত্যাদি।

১।যার RBC-তে A প্রোটিন আছে, তার ব্লাডগ্রুপ   A

২।যার RBC-তে B প্রোটিন আছে, তার ব্লাডগ্রুপ   B

৩।আর যার RBC-তে দু’টোই আছে, তার ব্লাডগ্রুপ  AB

৪।যার RBC-তে দু’টোর একটাও নেই, তার ব্লাডগ্রুপ হলো  O

৩য় প্রোটিন – অর্থাৎ, Rh – এটা যার রক্তে থাকবে, সে পজিটিভ, যার থাকবে না সে নেগেটিভ।

ধরুন, আপনার রক্তে A এবং Rh  প্রোটিন আছে – তাই আপনার ব্লাডগ্রুপ হবে A +ve

আবার ধরুন, আপনার বন্ধুর রক্তে A এবং B আছে, কিন্তু Rh  নেই – তাহলে তার ব্লাডগ্রুপ হবে AB -ve

এখন, ব্লাড ট্রান্সফিউশনের কিছু নিয়ম আছে। আবিষ্কারক কার্ল ল্যান্ডস্টিনারের নামানুসারে একে ল্যান্ডস্টিনার’স ল বলে।

যার শরীরে A প্রোটিন নাই (অর্থাৎ ব্লাডগ্রুপ B), তাকে A ব্লাডগ্রুপের রক্ত দিলে শরীরে রিয়্যাক্সন হবে, নতুন দেয়া রক্ত রিজেক্ট করবে, এমনকি মারাও যেতে পারবে।

ঠিক তেমনি ব্লাডগ্রুপ A ব্যক্তির লোকের শরীরে B-গ্রুপের রক্ত দিতে গেলেও একই সমস্যা হবে।

আবার ধরুন, দাতা এবং গ্রহীতার মধ্যে A আর B ম্যাচ করতে পারলেন। কিন্তু আরেকটা প্রোটিন/এ্যান্টিজেন যে রয়ে গেছে – Rh!

যার শরীরে Rh ফ্যাক্টর নাই (অর্থাৎ Rh -ve), তাকে Rh +ve ব্লাড দিতে গেলেও একই ধরণের রিয়্যাক্সন হবে – পুরো ব্লাড রিজেক্ট করবে।

A গ্রুপের দাতা শুধু A এবং AB গ্রুপের গ্রহীতাকে রক্ত দিতে পারবেন। (এখানে খেয়াল করুন, দাতা এবং গ্রহীতাদের সবারই রক্তে A প্রোটিন Common  আছে)।

তেমনি B গ্রুপের দাতা শুধু B এবং AB গ্রুপের গ্রহীতাকে রক্ত দিতে পারবেন। (এখানে সবার মাঝে B কমন)

আর AB গ্রুপের দাতা শুধু AB গ্রুপের গ্রহীতাকে রক্ত দান করতে পারবেন।

এই জন্য, সবচাইতে নিরাপদ উপায় হলো: যিনি রক্ত দেবেন তাঁর শরীরে কোনো এ্যান্টিজেন/প্রোটিন-ই না থাকা – অর্থাৎ ব্লাডগ্রুপ O-ve। তাই এদেরকে ইউনিভার্সাল ডোনার বলা হয় – এরা যে কাউকে রক্ত দিতে পারেন।

ঠিক তেমনি এর উল্টোও আছে – ইউনিভার্সাল রেসিপিয়েন্ট। এদের ব্লাড গ্রুপ হলো AB +ve – এদের A, B এবং Rh সব প্রোটিনই আছে। কাজেই যেকোনো ব্লাডগ্রুপই গ্রহণ করতে পারবে।

মা-বাবা গ্রুপিং সমস্যা

বিয়ের আগে এই জিনিসটা অর্থাৎ ছেলে ও মেয়ের রক্ত পরীক্ষা করে বিয়ে করা উচিত। তা না হলে স্বামী-স্ত্রীর হয়ত তেমন কিছুই হবেনা তবে তাদের অনাগত সন্তানের ভবিষ্যৎ পুরো অন্ধকার হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা প্রচুর। বিয়ের পর শারীরিক সম্পর্কের কারনে ও রক্তের মাধ্যমে বেশ কিছু সংক্রামক ও অসংক্রামক রোগ হতে পারে যেমন, এইচআইভি/এইডস, হেপাটাইটিস বি ও সি, ডায়াবেটিস, লিউকোমিয়া, সিজোফ্রেমিয়া ইত্যাদি। সেক্সুয়্যাল প্রবলেম যেমন স্বামী-স্ত্রীর নরমাল প্রোডাক্টিভিটি ও নষ্ট হতে পারে।

ব্যাপারটা নাহয় একটু ব্যাখ্যা করিঃ

যদি কোন নেগেটিভ রক্তের মহিলার সাথে পজিটিভ রক্তের পুরুষের বিয়ে হয়, তবে তাদের প্রথম বাচ্চা হবে পজিটিভ রক্তের, অর্থ্যাৎ বাচ্চার রক্তে Rh প্রোটিন থাকবে যা প্রকট বৈশিষ্ট্যের। প্রকট বৈশিষ্ট্য হলো যে বৈশিষ্ট্য প্রকাশ পায়। পজিটিভ রক্তে যেহেতু Rh এন্টিজেন/প্রোটিন ছিলো, তাই বাচ্চা পজিটিভ রক্তের হবে।

সবচেয়ে বড় ভয়টা এখানেই, মা নেগেটিভ রক্তের বলে বাচ্চার জন্মের সময় অমরার মাধ্যমে বাচ্চার রক্তে থাকা Rh এন্টিজেন মায়ের দেহে প্রবেশ করে (কারন বাচ্চা যেহেতু পজিটিভ রক্তের সুতরাং তার রক্তে Rh থাকবেই এবং অমরা মানে বাচ্চা যেখানে মায়ের উদরে থাকে)। এখন মার রক্তে Rh নেই কিন্তু সন্তানের কারনে ঢুকে পড়েছে। তাই মায়ের নেগেটিভ রক্ত আগত Rh কে শত্রু ভাবে এবং মায়ের দেহে অ্যান্টিবডি (বুঝার সুবিধার্তে অ্যান্টিবডিকে অ্যান্টিভাইরাসও ধরে নিতে পারেন) তৈরি করে। যার ফলে মায়ের রক্ত অ্যান্টিবডি/অ্যান্টিভাইরাস সমৃদ্ধ যা কোন রকমের পজিটিভ রক্ত পেলেই সেটাকে ধ্বংস করে ফেলে। এই অ্যান্টিবডি তৈরি হওয়ার আগেই প্রথম বাচ্চা ভূমিষ্ঠ হয় বলে প্রথম বাচ্চা কোনোরকমে বেচে গেলেও পরবর্তী বাচ্চা গুলো আর বাঁচেনা। কারন বাবার রক্ত পজিটিভ, মায়ের রক্ত পজিটিভ কিছু পেলেই ধ্বংস করে ফেলে। এইজন্য দ্বিতীয় সন্তান জন্মের আগেই মারা যায় মানে ভ্রুনে থাকতেই মৃত্যুবরন করে।

 বংশগত রোগ থ্যালাসেমিয়া (Thalassemia) নিয়ে আলোচনাঃ 

থ্যালাসেমিয়া (ইংরেজি ভাষায়: Thalassemia) একটি বংশগত রক্তের রোগ। এই রোগে রক্তে অক্সিজেন পরিবহনকারী হিমোগ্লোবিন কণার উৎপাদনে ত্রুটি হয়। থ্যালাসেমিয়া ধারণকারী মানুষ সাধারণত রক্তে অক্সিজেনস্বল্পতা বা অ্যানিমিয়াতে ভুগে থাকেন। অ্যানিমিয়ার ফলে অবসাদগ্রস্ততা থেকে শুরু করে অঙ্গহানি ঘটতে পারে। থ্যালাসেমিয়া দুইটি প্রধান ধরনের হতে পারে:

আলফা থ্যালাসেমিয়া ও বেটা থ্যালাসেমিয়া। সাধারণভাবে আলফা থ্যালাসেমিয়া বেটা থ্যালাসেমিয়া থেকে কম তীব্র। আলফা থ্যালাসেমিয়াবিশিষ্ট ব্যক্তির ক্ষেত্রে রোগের উপসর্গ মৃদু বা মাঝারি প্রকৃতির হয়। অন্যদিকে বেটা থ্যালাসেমিয়ার ক্ষেত্রে রোগের তীব্রতা বা প্রকোপ অনেক বেশি; এক-দুই বছরের শিশুর ক্ষেত্রে ঠিকমত চিকিৎসা না করলে এটি শিশুর মৃত্যুর কারণ হতে পারে।

বিশ্বে বেটা থ্যালাসেমিয়ার চেয়ে আলফা থ্যালাসেমিয়ার প্রাদুর্ভাব বেশি। আলফা থ্যালাসেমিয়া দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও চীনের সর্বত্র এবং কখনও কখনও ভূমধ্যসাগরীয় ও মধ্যপ্রাচ্যের লোকদের মধ্যে দেখতে পাওয়া যায়। প্রতিবছর বিশ্বে প্রায় ১ লক্ষ শিশু থ্যালাসেমিয়া নিয়ে জন্মগ্রহণ করে।

থ্যালাসেমিয়া নামের এই রোগটি বর্তমানে আমাদের দেশে প্রচুর। বাবা-মা দুইজনই এই রোগের বাহক হলে সন্তান জন্মের পরই এই রোগে আক্রান্ত হয় এবং সাধারনত ২১ বছরের বেশি বাঁচে না। এবং এতসব ঝামেলা এড়ানোর জন্যই বিয়ের আগে রক্ত পরীক্ষা অত্যন্ত জরুরি।একজন থ্যালাসেমিয়া রোগের বাহক সারাজীবন একজন সুস্থ মানুষের মতোই জীবনযাপন করতে পারে।

 640px-Autorecessive.svg

ইমেজ ইনফোঃ http://bn.wikipedia.org/wiki/%E0%A6%A5%E0%A7%8D%E0%A6%AF%E0%A6%BE%E0%A6%B2%E0%A6%BE%E0%A6%B8%E0%A7%87%E0%A6%AE%E0%A6%BF%E0%A6%AF%E0%A6%BC%E0%A6%BE#mediaviewer/File:Autorecessive.svg

থ্যালাসেমিয়ার বাহক বিয়ের জন্য অযোগ্য নয়। তবে সতর্কতার বিষয় হচ্ছে তাকে জীবনসঙ্গী হিসেবে বেছে নিতে হবে একজনকে যে থ্যালাসেমিয়ার বাহক নয়। আবার বাবা-মা উভয়েই যদি থ্যালাসেমিয়ার বাহক হন তাহলেও আশঙ্কার কিছু নেই। থ্যালাসেমিয়া ছোঁয়াচে রোগ নয়, জন্মগত প্রক্রিয়া ছাড়া অন্য কোনভাবে একজন থেকে আরেকজনের মধ্যে এ রোগ ছড়ানোর কোন আশঙ্কা নেই।

বাবা-মায়ের মধ্যে যেকোন একজন যদি বাহক হন, তাহলে সন্তানের থ্যালাসেমিয়া রোগে আক্রান্ত হবার সম্ভাবনা নেই তবে সন্তানটি প্রায় ক্ষেত্রেই থ্যালাসেমিয়া রোগের জীবাণু বহন করে বেড়ায়। তারমানে এই নয় যে সন্তানটি থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত, সে শুধু থ্যালাসেমিয়া বহন করছে মাত্র। তাছাড়া মা-বাবা উভয়েই বাহক, এরূপ দম্পতিদের ক্ষেত্রে গড়ে ৪ জনে একজন সন্তান মারাত্মক থ্যালাসেমিয়া রোগ নিয়ে জন্মগ্রহণ করবে, দু’জন বাহক হিসেবে জন্মগ্রহণ করবে এবং অবশিষ্ট একজন হবে সম্পূর্ণ সুস্থ শিশু।

এ রোগ প্রতিরোধের প্রধান উপায় হচ্ছে কোন থ্যালাসেমিয়া বাহক ব্যক্তির সঙ্গে আরেকজন বাহকের বিয়ে না হওয়া। কারন আমার জানামতে থ্যালাসেমিয়ার জন্য এখনো কোন শক্তিশালী প্রতিষেধক তৈরি হয়নি। সে কারণে বিয়ের বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার আগে পুরুষ-নারী উভয়েরই রক্ত পরীক্ষা করা অত্যন্ত জরুরি। বাংলাদেশে পুরুষ ও নারী মিলিয়ে প্রায় দেড় কোটি থ্যালাসেমিয়ার বাহক আছে। এবং প্রতি বছর বাংলাদেশ থেকে ৩-৬ হাজার শিশু থ্যালাসেমিয়া রোগ নিয়ে জন্মগ্রহন করছে। এ বিষয়ে সচেতনতা গড়ে তোলা এবং বিষয়টিকে গ্রহণযোগ্য করে তুলতে ব্যাপক প্রচারণা চালানো অত্যাবশ্যক যে, থ্যালাসেমিয়া আসলে কী এবং কেনই বা প্রয়োজন এত সতর্কতা?

আরো পোস্ট দেখুন

comments