কর্মক্ষেত্রে সাফল্যের পাসওয়ার্ড

সাফল্যের সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা নেই। তবুও সাফল্য লাভের জন্য আধুনিক এই কর্পোরেট কালচারের যুগে গ্রাহকসুলভ আচরণকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়। ব্যবসা কিংবা অফিস, সব ক্ষেত্রেই এমন আচরণ প্রতিষ্ঠান কিংবা কর্মীর জন্য সাফল্য নিয়ে আসে। গ্রাহকসুলভ আচরণ নিয়ে এই লেখায় জানাচ্ছেন আফরিন জাহান

career

  • কর্মক্ষেত্রে সাফল্যের জন্য উন্মুখ থাকেন সকলেই। তবে সকলেই কি সফলতা পান? এই প্রশ্নের উত্তর সন্দেহাতীতভাবেই হবে ‘না’। কিন্তু কেন সকলে সফলতার সেই শিখরে পৌঁছাতে পারেন না?

    আসলে সাফল্যের জন্য সুনির্দিষ্ট কোনো মাপকাঠি নেই। প্রতিটি ক্ষেত্রের জন্যই সাফল্যের আলাদা আলাদা নিয়ামক রয়েছে। কঠোর পরিশ্রম, সততা, নিষ্ঠা প্রভৃতি গুণাবলী অবশ্য প্রতিটি ক্ষেত্রেই সাফল্যের পূর্বশর্ত। তবে এর বাইরেও আলাদা আলাদা কাজে সাফল্যের জন্য আলাদা আলাদা বিষয় অনুসরণ করতে হয়। তবে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে যারা উচ্চপদে আসীন রয়েছেন, তাদের সকলের জন্যই একটি বিষয় মেনে চলা প্রয়োজন। আর তা হলো অধীনস্ত সকলের সাথে আন্তরিক সম্পর্ক বজায় রাখা। একজন ব্যবসায়ী যেমন তার প্রতিটি কাস্টমার বা গ্রাহকের সাথে যথাসম্ভব আন্তরিক ব্যবহার করেন, তেমনি উচ্চপদস্থদেরও অধীনস্তদের প্রতি তেমন ব্যবহার নিশ্চিত করতে হয়। বস্তুতপক্ষে আধুনিক কর্পোরেট কালচারে সহকর্মী সকলের সাথেই গ্রাহকের মতো আচরণ করা যুক্তিযুক্ত।

    কর্পোরেট কালচারের মতো ব্যবসাতেও গ্রাহকদের সাথে আচরণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আপনার সহকর্মীর সাথে আপনার কাস্টমার-ফোকাসড অ্যাসেসমেন্টের উপর এখানে কয়েকটি ধারণা দেওয়া হলো যা আপনার ক্যারিয়ার এবং ব্যবসায় সহায়তা করবে।

  • আপনার কর্মচারীরা হচ্ছে প্রতিবিম্ব। যারা আপনার জন্য কাজ করে তারা আত্মহীন নয়। তাদের নানা আচরণেই নিজের চাকরি সম্পর্কে তাদের অনুভূতির বহিঃপ্রকাশ ঘটে। আপনি যদি আপনার কর্মীদের সাথে ভদ্রতা ও সম্মানজনক আচরণ করেন যা আপনি আপনার কাস্টমারের সঙ্গে করেন, তাহলে পরবর্তী সময়ে তাদের আচরণেও এটি প্রকাশ পাবে। ‘হাউ টু থিংক লাইক দ্য ওয়ার্ল্ডস গ্রেটেস্ট নিউ মিডিয়া মগলস’-এর লেখক মার্সিয়া লেটন টার্নার বলেন, আপনার কর্মীরাই আপনার ব্যবসার প্রতিবিম্ব। আপনি যদি চান যে আপনার কর্মীরা আপনার জন্য কাজ করে গর্বিত বোধ করুক, তাহলে তাদের সাথে সেভাবেই আচরণ করতে হবে। কর্মীরা যদি অফিস বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের প্রতি অনুগত এবং আন্তরিক বোধ না করে, তার প্রভাব অন্যদের মধ্যেও বিশেষ করে কাস্টমারদের মধ্যেও জাগবে। এটা কখনই কাম্য হতে পারে না।

    বিশ্বস্ত কাস্টমার হিসেবে আপনার কর্মীদের মূল্যায়ন করুন। তাহলে সবসময় তারা আপনার সাথে থাকবে। ক্লায়েন্টের মতো আপনি আপনার কর্মীদের অংশগ্রহণ এবং সামর্থ্যের কথা কখনও ভুলে যাবেন না। উত্সাহ দেওয়া ভালো তবে বাস্তব পুরস্কার আরও বেশি ভালো। কর্মীদের প্রণোদনা নিশ্চিত করতে কম্পেনসেশন বা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার প্যাকেজ এবং বোনাস প্রোগ্রাম চালু করুন। আপনার অফিস বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে এমন একটি পরিবেশ বজায় রাখুন যাতে কর্মীরা আপনার ব্যবসার সাথে সংশ্লিষ্ট হয়ে যেতে পারে; প্রতিষ্ঠান বা আপনার সাফল্যের সাথেও যেন তারা একাত্ম হতে পারে। এতে করে প্রতিষ্ঠানের প্রতি তারা অনেক বেশি অনুগত হবে এবং প্রতিষ্ঠানের সাফল্যে নিজেরাও গর্বিত হবে। ফলে তাদের কাজের প্রেরণা বেড়ে যাবে।

    কথা-বার্তা বা আলাপ-আলোচনা সহজ নয়। তবে এই কাজটির চর্চাও রাখতে হবে। বেশিদিন আগের কথা নয়, যুক্তরাষ্ট্রের একজন ন্যাশনাল ফুটবল লিগ কোচের স্ত্রী জানতে পারলেন যে তার স্বামীকে বেত মারা হয়েছে। সমস্যাটা ছিল এই যে, তিনি এই খবরটা রেডিও প্রোগ্রামের মাধ্যমে জেনেছিলেন। এ রকম কমিউনিকেশন মিসহ্যাপ ছোট ব্যবসার জন্য ক্ষতির কারণ হয়। এ জন্য এ রকম যাতে না ঘটে তার ব্যবস্থা নিতে হবে। আপনি যেমন আপনার কাস্টমারকে কোনো কিছু সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেন, সে রকম আপনার কর্মীদের সাথেও নিয়মিত কথা বলুন। তাদের অনুরোধের ফিডব্যাক দিতে হবে এবং তাদের নতুন প্রোডাক্টস, সার্ভিস অথবা প্রসিডিউরের সাথে আপডেট করার সুযোগ দিতে হবে। টার্নার বলেন, ‘তাদের জন্য কোনো কিছু করার আগে তাদের সম্পর্কে জানতে হবে। তারা যেন এটুকু নিশ্চিত থাকে যে অন্য কেউ কোনো বিষয় সম্পর্কে জানার আগেই তারা জানবে এবং সে সম্পর্কে তারাই সবার আগে বলতে পারবে।’

    স্পষ্টবাদী হতে হবে। আপনার এমন কাস্টমার থাকতে পারে যার ডিপ্লোম্যাসি/ কূটনীতি, বাউন্সড চেক কমনসেন্স কিংবা সাধারণ জ্ঞান আপনাকে বাধ্য করে তার সাথে ব্যবসায় ভদ্রভাবে কোনো কিছু বলতে। একজন কর্মী যে আপনার আশানুরূপ কাজ করছে না তাকেও আপনি এই দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখতে পারেন। নিম্নমানের কোনো কর্মচারীকে বিদায় করতে সংকোচ বোধ করবেন না। এটা যথাসম্ভব ভদ্রোচিতভাবে করতে হবে। টার্নার বলেন, ‘তাদেরকে নতুন কাজ খুঁজতে সাহায্য করুন, রেফারেন্সের অফার দিন এবং ভালো কিছু করতে সাহায্য করুন। একজন অসন্তুষ্ট ফরমার ইমপ্লয়ি ভালো বিজ্ঞাপনদাতা।’ সেই বিজ্ঞাপন আপনার প্রতিষ্ঠানের জন্য নিঃসন্দেহে সুফল বয়ে আনবে না। তাছাড়া আপনার ভালো কোনো কর্মীও প্রতিষ্ঠান ছেড়ে আরও ভালো সুযোগ পেয়ে চলে যেতে পারে। কর্মীদের সাথে ভালো আচরণ করলে সেটা আপনার জন্য ইতিবাচক ফলাফল বয়ে আনবে।

    আপনি যদি কর্মী হয়ে থাকেন, তাহলে প্রশ্ন করুন। একজন কর্মী হিসেবে জব/কাজ আপনার উপর চাপিয়ে দেওয়া হয়, সেটা সম্পর্কে আপনার সম্যক ধারণা থাকা উচিত। আর তার জন্য প্রশ্ন করে কাজটি সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে নিতে দ্বিধা বোধ করবেন না। তাতে ক্ষতিটা আপনারই হবে। আপনি কাস্টমার হিসেবে যেমন কোনো সেবা বা পণ্যের বিস্তারিত জানতে প্রশ্ন করে থাকেন, তেমনি কর্মী হিসেবেও আপনার উপর অর্পিত কাজগুলো সম্পর্কে প্রশ্ন করে বিস্তারিত জেনে নিন।

    ব্যবসায় অভিজ্ঞতা সীমাহীন অবাস্তব আশাকে ত্যাগ করতে বাধ্য করে। এটা একজন কর্মীর ক্ষেত্রেও সত্য। কাজেই আপনার কর্মীদের সাথে সেভাবেই আচরণ করুন, যেন তাদের অভিজ্ঞতাগুলো প্রতিষ্ঠানের ভালোর জন্য ব্যবহার করা যায়। আর আপনি কর্মী হলে আপনার অভিজ্ঞতা যাতে প্রতিষ্ঠানের সুফল বয়ে আনে, তার জন্য কাজ করুন।

    না বলতে ভয় পাবেন না, সেটা আপনি কর্মীই হোন আর বসই হোন। কর্মী হলে আপনার গণ্ডির বাইরে কোনো কাজ দেওয়া হলে সেটা ভদ্রভাবে নাকচ করে দিন। কারণ এতে কাজটি সঠিকভাবে নাও হতে পারে যা প্রতিষ্ঠানের জন্য সুফল আনবে না। আবার কর্মীর অবৈধ আবদারকেও প্রশয় দেবেন না। সেক্ষেত্রে সরাসরি না বলাই ভালো।

 

সূত্রঃ দৈনিক ইত্তেফাক

আরো পোস্ট দেখুন

comments